আত্মচেতনা

মাষ্টার গিয়াস উদ্দিন, ব্যাচঃ 1978
হাই স্কুল জীবনের কোন্ শ্রেণিতে পড়েছিলাম ঠিক মনে নেই, তবে গল্পটার মূলভাব বেশ মনে আছে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এ কথা ভেবে আমাদের এ সমাজব্যবস্থায় এমন কিছু ছোটবড় মানুষ আছে, যারা পুরো কর্মক্ষম হলেও বাস্তবে তেমন কোন কাজ করতে চায় না। বর্তমানে এ উদ্ভট ও অথর্ব চিন্তা চেতনা বিশেষ করে অধিকাংশ ছাত্র, তরুন এবং যুবসমাজের মধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমনকি তারা নিজের ব্যবহার্য ও একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পর্যন্ত নিজেরা কর্মের মাধ্যমে শেষ করে না। অনেকে নিজের পরিধানের পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে পুরোপুরি লন্ড্রিওয়ালার উপর নির্ভরশীল। অথচ, কাজ মানে কাজ। এখানে কোন প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব, লাজ- লজ্জা থাকার কোন কথা নয়। কিন্তু তারা পারিবারিক খুঁটিনাটি কাজকর্ম থেকেও নিজেকে নিরাপদ দুরত্বে রাখার নানান ছলাকলার আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা ভুলে যেতে বসেছে যে, কাজের মাধ্যমে একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক গঠনমূলক চিন্তা চেতনা বৃদ্ধি পায়। সৃষ্টিশীলতার বাস্তব জ্ঞানধ্যান ও প্রেরণা বিকশিত হয়। 

যাক, আসল কথায় ফিরে আসি। আলোচ্য এ গল্পটি লিখেছিলেন বাংলা ও বাঙালীর অন্যতম প্রিয় কবি জসিমউদ্দীন। যিনি পূর্বাপর সকলের কাছে পল্লী কবি হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। কবি একবার আমেরিকা গেয়েছিলেন। কিছুদিন থাকবেন বলে সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে উঠলেন। সকালে তাঁর কক্ষে ১০/১২ বছরের একটি ছোট ছেলে নাস্তা দিয়ে গেল। দুপুরে সে আবার খাবার নিয়ে এলো। কবি মনেমনে খুব অবাক হলেন। ভাবলেন, আমেরিকার মতো একটি দেশেও এত ছোট ছেলে হোটেলে চাকরি করে কেন? তিনি ছেলেটিকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন তার নাম কি, বাবা-মা কি করেন ইত্যাদি। ছেলেটি তার নাম বললো। বাবা একজন সরকারি চাকুরিজীবি এবং মা একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এ কথা শুনে কবি আরও বিস্মিত হলেন। তারপর আবার জানতে চাইলেন যে, সে এ হোটেলে চাকরি করে কেন? উত্তরে ছেলেটি বললো যে, সে আসলে এখানে কোন চাকরি করে না। তাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। বিদ্যালয় কিছুদিন বন্ধ থাকবে। এ ছুটিতে সে ইউরোপের ২/৩ টি দেশ ভ্রমনে যাবে। তার কিছু বাড়তি টাকার প্রয়োজন। মা-বাবা যা দেবে তার সাথে সে হোটেল থেকে কাজের পারিশ্রমিক বাবত যা পাবে তা  দিয়ে তার ভ্রমন পর্ব বেশ চলে যাবে। পরিবার থেকে অতিরিক্ত কোন টাকা আর প্রয়োজন হবে না। কবি জানতে চাইলেন যে, ছেলেটি কেন ইউরোপ ভ্রমনে যাবে। ছেলেটি হেসে বললো সে ওই দেশের মানুষের আচার-আচরণ, জনজীবনের গতি-প্রকৃতি, কৃষি-শিল্প, খনিজ ও প্রাকৃতিক এবং তাপমাত্রা ইত্যাদি বিষয়ে ঘুরেঘুরে সচক্ষে দেখবে। তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে সব বিষয়ের উপর একটি প্রতিবেদন রচনা করবে। ফলে তাকে আর অন্য কোন লেখকের বই পড়ে সে দেশের ভূগোল সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে হবে না। কবি ছেলেটির দিকে তাকিয়েই রইলেন। ছেলেটি বললো অন্যরুমে খাবার নিয়ে যেতে হবে, আমি এখন আসি স্যার। ছেলেটি চলে যাবার পর কবি ভাবলেন শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর সাথে আমাদেরতো আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অপরদিকে, অন্য একটি বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। সেদিন আমাদের মিরসরাই কিন্ডারগার্টেন এর সম্মানিত শিক্ষকমন্ডলী মীরসরাই সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পরিষদের সুযোগ্য সাধারণ সম্পাদক মিঃ প্রবাল ভৌমিকের লেখা ‘একাল-সেকাল’ প্রবন্ধটি আমার ফেসবুক থেকে পড়ে সবাই প্রানবন্ত আলোচনায় মেতে উঠলেন। সবাই একমত যে, লেখাটি খুব সময়োপযোগী। বিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত শিক্ষক হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যার আজকাল পাঠ্য বইয়ের বাইরে জ্ঞান বিজ্ঞান সহ সাহিত্যের বইগুলো বর্তমানের ছাত্রছাত্রীরা তেমন পড়ে না তাতো বুঝলাম। তিনি বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মিঃ কিংশুক দাশ গুপ্ত। আমাকে বললেন, এখন আমি আপনাকে যে তথ্যটি দেবো তা আরও বেশি বিপদের বার্তা বহন করে। তিনি যা বললেন, “আমেরিকার নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি ওয়ার্ল্ড গবেষণাকেন্দ্র জরিপ চালিয়ে বলেছে যে, বর্তমানে তরুন সমাজ যে হারে মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে, তাতে আগামী বিশ বছরে তারা জীবনের অনেক মৌলিক বিষয়ে অজ্ঞতার পরিচয় দেবে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রেক্ষিত সম্পর্কে বিবেচনা করা উচিত। এ সমস্যা সমাধানে তারা সুপারিশ করে বলেছে যে, তরুন সমাজ আরও বেশি জ্ঞানবিজ্ঞানের বই পড়তে হবে।” আসলে, এ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে একে অতিক্রম করার কোন চিন্তা-ভাবনা কি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি সহ সচেতন মহলের চিন্তা-চেতনায় আছে?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

" বিজয় ও অভ্র " ----যাদের কল্যাণে আমরা বাংলায় কথা বলি

মা

প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পরিষদের পথচলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ